জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গুলির আঘাতে খোকন চন্দ্র বর্মণের মুখের আদল বদলে গেছে। দীর্ঘ দিন চিকিৎসার পর গত ১৬ এপ্রিল রাশিয়া থেকে দেশে ফেরেন তিনি। চিকিৎসকদের পরামর্শ ছিল, জুন মাসেই আবার রাশিয়ায় গিয়ে ফলোআপ চিকিৎসা নিতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও দুই মাস ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরছেন তিনি। চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের তারিখও কয়েক দফা পেছানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৪ আগস্ট তাঁর রাশিয়া যাওয়ার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ হয়েছে।
শুধু খোকন নন, আন্দোলন চলার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া অন্তত ৬০ জনের ফলোআপ চিকিৎসার প্রক্রিয়া প্রশাসনিক জটিলতার কারণে খুবই ধীরে এগোচ্ছে। আহত ব্যক্তিদের অভিযোগ, তাঁদের চিকিৎসাসংক্রান্ত ফাইল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ), বা অন্য দপ্তরে ঘুরছে। কোথায় ফাইল আছে, কখন সিদ্ধান্ত হবে–এরও তথ্য পাওয়া কঠিন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১০৫ জন দেশে ফিরেছেন। বর্তমানে ৩৯ জন বিদেশে চিকিৎসাধীন। দেশে ফেরা আহতদের মধ্যে ৬০ জনের ফলোআপ চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও বেশির ভাগই বিদেশ যেতে পারেননি। গত ১৫ মার্চ পর্যন্ত আহতদের চিকিৎসায় সরকারের ব্যয় হয়েছে ৩৪৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯৯ হাজার ২০৭ টাকা।
মুখ পুনর্গঠনের অপেক্ষায় খোকন আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হন খোকন চন্দ্র বর্মণ। খুব কাছ থেকে ছোড়া গুলিতে তাঁর চোয়াল ও নাক ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। প্রায় ছয় মাস জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাঁকে রাশিয়ার মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির একটি ক্লিনিকে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে তাঁর চোয়াল ও নাক প্রতিস্থাপন এবং পরে মুখের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর পুনর্গঠন করা হবে। চিকিৎসকদের মতে, এসব অস্ত্রোপচার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা জরুরি।
পাঁচ মাস ধরে আটকে আনোয়ারের ফলোআপ গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর শাহজাদপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন আনোয়ার হোসাইন। তাঁকে থাইল্যান্ডের ব্যাংককের একটি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ছয় মাস আট দিন চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফেরেন তিনি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর আবার বিদেশে গিয়ে ফলোআপ চিকিৎসা নেওয়ার কথা। কিন্তু প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে সেই যাত্রা আটকে আছে। আনোয়ার বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গেলে বলে কাগজ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ)। সেখানে গেলে বলে মেডিকেল বোর্ড মিটিংয়ের পর কাগজ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে জানতে চাইলে বলে, এখন কাগজ কোথায় আছে, সে ব্যাপারেও তারা নিশ্চিত নয়। তিনি জানান, একপর্যায়ে তাঁর স্ত্রী বিএমইউতে খোঁজ নিতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, তাঁদের ফাইল পড়ে ছিল এবং বিষয়টি নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। পরে জানানো হয়, বোর্ড সভায় আগামী ৬ আগস্ট বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে। তবে সে প্রক্রিয়াও এগিয়েছে কিনা, তা এখনও জানা যায়নি। বর্তমানে আনোয়ার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, সেখানে তাঁর মতো আরও কয়েকজন আহত ব্যক্তি আছেন।
বোর্ড না থাকায় ঝুলে আছে মাসুমের চিকিৎসা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হন মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ। তাঁর বুকে দুটি গুলি লাগে। একটি অপসারণ করা হলেও অন্যটি এখনও স্নায়ুর কাছে রয়ে গেছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, অস্ত্রোপচার করলে তাঁর হাত স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যেতে পারে। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে। তবে এখনও তিনি যেতে পারেননি। মাসুম বলেন, পাঁচ-ছয় মাস আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। তাঁকে জানানো হয়, নতুন মেডিকেল বোর্ড গঠনের পর তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আহত ব্যক্তিদের বিদেশে পাঠানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বর্তমানে সেই বোর্ড আর কার্যকর নেই। নতুন বোর্ডও এখনও গঠন করা হয়নি। ফলে নতুন কোনো ফাইলের কার্যক্রম কার্যত এগোচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিএমইউ এবং মেডিকেল বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই ফলোআপ চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিদেশে থাকা আহত ৩৯ জনের প্রায় সবাই থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন। তাঁদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ হয়ে অর্থোপেডিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই সঙ্গে আরও ১২ জনকে দ্রুত বিদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
বিদেশি বিশেষজ্ঞও আসছেন সরকার আহতদের বিদেশে পাঠানোর পাশাপাশি বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বাংলাদেশে এনে চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে। গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল বাংলাদেশে এসে আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ২২ জনের দুই পা কেটে ফেলা হয়েছে, ১১ জন দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। ৪৯৩ জন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। এ ছাড়া ২৮ জন দুই চোখে এবং ৪৭ জন এক চোখে আংশিক দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি থাকায় তাঁদের নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা প্রয়োজন।
দেশে চিকিৎসাধীন ১২ জন সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল), বিএমইউ, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) এখনও প্রায় ১২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সরকারের আরও আন্তরিক হওয়ার দাবি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য জাহিদ হোসেন বলেন, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিয়ে অনেকের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। যাঁদের এখনও ফলোআপ চিকিৎসা প্রয়োজন, তাঁদের দ্রুত বিদেশে পাঠাতে সরকারের আরও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।
যা বলছেন দায়িত্বশীলরা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শাখার উপসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন এমন আহতদের কোনো তালিকা তাদের কাছে নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তালিকা পাঠালে তারা বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারণে যদি বিদেশে চিকিৎসা নিতে বিলম্ব হয়ে থাকে, তাহলে কারণ খুঁজে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।