রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর জন্য গতকাল রোববার দুটি মনোনয়নপত্র কিনেছে বিএনপি। একই দিনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রীতি ভাঙতে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের নাম ঘোষণা করেছে। বিএনপি কারও নাম ঘোষণা না করলেও সূত্র জানিয়েছে দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হতে পারেন রাষ্ট্রপতি প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্টের মধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। এরপর যাচাই-বাছাই। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে ২০ আগস্ট। সংসদ সদস্যরা (এমপি) ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
চট্টগ্রাম-৪ আসন শূন্য থাকায় ৩৪৯ আসনের সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে প্রয়োজন ১৭৫ ভোট। বিএনপির এককভাবে রয়েছে ২৪৭ এমপি। জামায়াত জোটের এমপি সংখ্যা ৯০। ভোট হবে প্রকাশ্য ব্যালটে। দলের বাইরে এমপিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত।
১৯৯১ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেওয়ায় সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর সেবারই প্রথম এবং শেষবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হয়েছিল। বিএনপি প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে জামায়াতের ১৮ এমপি ভোট দেন বিএনপি প্রার্থীকে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট । জাতীয় পার্টির ৩৫ এমপি ভোট দেননি। ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ৩৫ বছর পর ভোট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কার্যালয় থেকে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ও অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী বিএনপির পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, রোববার থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু হয়। সকালে বিএনপির প্রতিনিধিদল মনোনয়নপত্র নিয়েছে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলের একাধিক জেষ্ঠ্য নেতা ছাড়াও শিক্ষাবিদ, সরকারি আমলার নাম আলোচনায় থাকলেও সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপিতে বিশ্বস্ততা ও দুঃসময়ের কান্ডারি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সজ্জন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি পরিচিত। রাজনৈতিক বিতর্কে শালীনতা বজায় রাখা এবং মার্জিত আচরণের জন্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছেও সমানভাবে শ্রদ্ধেয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির দুঃসময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব ছাড়াও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খানের নামও আলোচনায় আছে। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে এখনও কাউকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়নি। গণমাধ্যমকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই বিষয়ে আমি কিছু জানি না। দলের পক্ষ থেকে আমাকে কিছু বলা হয়নি।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে একই ব্যক্তির নামে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার বিধান আছে। কারণ, একটি মনোনয়নপত্রে কোনো ভুলত্রুটি থাকলে যাতে অন্যটি বিবেচনায় নেওয়া যায়। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনের সময়ও এমনটা করা হয়েছিল।
গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় কর্নেল অলি হবেন তাদের প্রার্থী। বৈঠকের পর অলি আহমদ ১১ দলীয় ঐক্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নাই, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগ নাই, সুন্দরভাবে জীবনযাপন করেছি। তাই সবাই সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর জন্য আমার নাম প্রস্তাব করেছেন।
সংসদের আসনের সমীকরণে বিরোধী জোটের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবু কেন রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হচ্ছেন– এর কারণ জানিয়ে অলি আহমদ বলেন, প্রার্থী চূড়ান্ত করার মাধ্যমে ১১ দলীয় ঐক্য জনগণকে বার্তা দিতে চায় যে, কর্নেল অলি দেশের অভিভাবকত্বের যোগ্য। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। গণতন্ত্রের জন্যও এই প্রক্রিয়া প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক হওয়া উচিত।
প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের জন্য রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়াকে দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি। আমরা মনে করি, সব ক্ষেত্রে রাজনীতি স্বচ্ছ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া উচিত। তাহলে গণতন্ত্রের গতি ফিরে আসবে।
এনসিপি আহ্বায়ক এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ এবং রাষ্ট্রসংস্কারে বিএনপি অনীহা দেখিয়েছে। পূর্বতন সরকারগুলোর মতোই এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের মাধ্যমে হবে। কিন্তু বিএনপি এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়নি।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বিএনপি সংস্কারের পথে হাঁটলে ঐক্যবদ্ধভাবে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল মিলে এককভাবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়া যেত। তবে তারা সেটা করেনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, যোগ্য একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে পারায় আমরা আনন্দিত।
রাষ্ট্রপতির শপথের জন্য ছয় কমিটি
নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে আয়োজনে ছয়টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এসব কমিটি গঠন করে অফিস আদেশ জারি করেছে। কমিটিগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। কমিটির সদস্যদের দ্রুত সভা আহ্বান করে কর্মপরিকল্পনা নিতে বলা হয়েছে।