জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যা বাজার পুনরুদ্ধারের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। কয়েক বছরের অর্থনৈতিক সংকট এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে পুঁজিবাজার যেখানে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল, সেখানে এই অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা বাজারকে আরও পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসির (সিবিপি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘রাজনৈতিক রূপান্তর এবং পুঁজিবাজার: বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা’ শীর্ষক এক বিশেষ বক্তৃতায় এসব কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের শিক্ষক ড. অনিরুদ্ধ মিত্র। অনুষ্ঠানে আয়োজকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার অব বাজেট অ্যান্ড পলিসির পরিচালক অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম, সহযােগী অধ্যাপক এবিএম ওমর ফারুক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. ফাহমিদুল হক, উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ নাজমি সাবিহা প্রমুখ। ড. অনিরুদ্ধ মিত্র তাঁর গবেষণা পত্রে ‘সিন্থেটিক কন্ট্রোল মেথড’ ব্যবহার করে দেখান, ইউক্রেন যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের যে পতন হয়েছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিতিশীলতা এবং নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে বিনিয়োগকারীরা এক প্রকার ধোঁয়াশার মধ্যে ছিলেন বা বুঝতে পারছিলেন না, নিকট-ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে। এ কারণে পুঁজিবাজার ‘ডিপ সিঙ্ক’ বা গভীর পতনের মধ্যে পড়ে যায়। বক্তৃতায় উঠে আসে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান মূলত তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, যা কর্মসংস্থানের অভাব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে তৈরি হয়েছে। তবে ড. মিত্র সতর্ক করে বলেন, পুঁজি ও শ্রমের মধ্যে যে সামাজিক চুক্তি থাকে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। নতুন অর্থনীতি ‘অলিগার্ক’ বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করবে নাকি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনও প্রবল সংশয় রয়েছে। ড. মিত্রের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে, যার প্রভাব সরাসরি পুঁজিবাজারে পড়েছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের আর্থিক খাত এই সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। বক্তৃতার পর মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা পুঁজিবাজারের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরেন। তারা জানান, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ এটি মূলত অতি নগণ্য সংখ্যক ব্যক্তি বিশেষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানোর যে প্রবণতা ছিল, তা বাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।