হাসিনা যে ভাষায় কথা বলতেন, বিরোধী দলও সেই ভাষায় কথা বলছে: মির্জা ফখরুল
‘হাসিনা যে ভাষায় কথা বলতেন, বিরোধী দলও সেই ভাষাতেই কথা বলছে’—বিরোধী দলের সমালোচনা করে এমন মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চ্যারিটি সংস্থা লাভ শেয়ার বিডির নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘সুবিধাবঞ্চিতদের স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্প’-এর উদ্বোধন এবং রংপুর অঞ্চলের ২৫ জন সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তির মধ্যে ২৫টি চা-ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের একটা বিরোধী দল আছে। এই বিরোধী দল দুর্ভাগ্যক্রমে আবার সেই আগের মতোই ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। হাসিনা যে ভাষায় কথা বলতেন, এরাও সেই ভাষাতেই কথা বলছে। ‘করতে দিব না, চলতে দিব না, শেষ করতে দিব না’—হ্যাঁ, এসব বলতে শুরু করেছেন না?”
সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আরে বাবা, হয়েছে তো মাত্র চার-পাঁচ মাস। এই চার-পাঁচ মাসেই তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। বহু পরিবর্তন! একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলা শুরু হয়েছে। একটা বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের তো চ্যারাগ নেই হাতে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও আগের সরকারের সময়ের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের দেশে একটা বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। প্রায় ১৫-১৬ বছরের একটা ভয়াবহ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বলি, ফ্যাসিজম বলি, স্বৈরাচার বলি—যাই বলি না কেন, অত্যাচার-নির্যাতনের পরে একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একটা দম ফেলার সুযোগ হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘৬০ লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ছিল সারা দেশে। ৬০ লক্ষ! এবং আমার এখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষকে গুম করে দেওয়া হয়েছিল। জুলাইয়ের মধ্যে তো প্রায় ৪ হাজার ছাত্র, শিশু, নারীকে হত্যা করা হয়েছে। এই একটা ভয়াবহ ঘটনার পরে একটা নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেই সুযোগটা হচ্ছে দেশটাকে আবার গড়ে তোলার।’
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের একটা প্রতিষ্ঠান আছে বাপেক্স। সেই বাপেক্সকে দিয়ে আমরা গ্যাস বা তেল আহরণ করার চেষ্টা করি, খোঁজার চেষ্টা করি কূপ খনন করে। সেটাকে পঙ্গু করে রেখে দিয়েছিল। সেটাকে আবার চালু করা হয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমাদের এখানে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য টেন্ডার করা হয়েছে, সেগুলো আসছে।’
জ্বালানি পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনার এই যে তেল আর গ্যাস, এটা বিদেশ থেকে আনতে হয় জাহাজে করে এবং সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়। এই যুদ্ধ, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ—এই যুদ্ধের ফলে আমাদের প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়ে গেছে, ইতিমধ্যে বেশি পেমেন্ট করতে গিয়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর মধ্যেও কিন্তু একদিনও আপনারা তেল ছাড়া থাকেননি, একদিনও কিন্তু আপনারা গ্যাস ছাড়া থাকেননি। কমেছে, হয়তো বা যেটা আপনারা আগে ১০টা পেতেন এখন হয়তো চারটা পাচ্ছেন, পাওয়া তো যাচ্ছে। এটা আমরা চেষ্টা করছি, ইনশাআল্লাহ অতি অল্প সময়ের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হবে।’
পণ্যের দাম বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যেটা আমদানি করতে হয়, সেই কারণে দাম বাড়ে। জিনিসপত্রের দাম একটু বেড়েছে, কেন? যেটা আমদানি করতে হয়, ওই জাহাজের ভাড়া তো বেড়ে গেছে। সবকিছুই বেড়ে যায়, যখনই ভাড়া বাড়ে তখন সবকিছু বাড়তে থাকে, ফলে এই সমস্যাটা আসে।’
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই যে মধ্যপাড়া, বড়পুকুরিয়া আছে না? যেখানে কয়লার খনি আছে, পাথরের খনি আছে, এটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটাকে আবার চালু করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই জিনিসগুলো আমাদের বুঝতে হবে, সেখানে অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’
রংপুর ও উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আরেকটি কথা বলেছেন—তিনি এই রংপুর বিভাগ, উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে চান। যার ফলে কী হবে? কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, কাজ পাব, বেকার থাকব না।’
সরকারের গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেখতে হবে যে এই সরকার একদিকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, পার্লামেন্ট হয়েছে, কথা বলার সুযোগ আছে। পত্রিকাগুলো এখানে আছেন—যারা আগে আওয়ামী লীগের আমলে লিখতেই পারত না, কথা বলতেও সাহস করত না। এখন যা খুশি লিখছে, সত্য-মিথ্যা যাই হোক।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘তা বাদে আবার আছে আপনাদের সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, কী কী যেন আছে না? ওইখানেও তো দেখেন কী সমস্ত যা খুশি তাই চালাচ্ছেন তারা, যার সত্যতার মধ্যে কিছু থাকে না। এই জিনিসগুলোকে মোকাবিলা করে, চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করেই আমাদের এগোতে হচ্ছে।’
দেশ গড়ার কাজে জনগণের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে ওয়াদাবদ্ধ যে আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করব দেশের উন্নয়নের জন্য। এটা আমরা প্রতিজ্ঞা করি। জনগণের কাছে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ যে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আমরা পালন করার চেষ্টা করব।’
সরকারের বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেছিলেন, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া শুরু হয়েছে। তিনি কৃষক কার্ডের কথা বলেছিলেন, কৃষক কার্ড দেওয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, যেসব কৃষক ঋণগ্রস্ত, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে—সেটা সম্পূর্ণ মাফ করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারেক রহমান খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছেন। খাল কেটে সেচের জন্য পানি আনার ব্যবস্থা শুরু করেছেন। তিনি মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধ ধর্মের পুরোহিত ও চার্চের ফাদারদের সম্মানী ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যাঁরা খেলোয়াড়, প্রাক্তন খেলোয়াড়, তাঁদের দুস্থ ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। এই যে এবারে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করা, এই কাজটা তিনি শুরু করেছেন।’
রংপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘রংপুরের লোকেরা আমরা সবসময় পিছিয়ে পড়া। কেন পিছিয়ে পড়া? আমরা তো সঠিক জিনিসটাই বুঝি না। যখন বিএনপি সরকার আসবে তখন আপনারা করবেন জাতীয় পার্টি। যখন বিএনপি সরকার আসবে তখন আপনারা করবেন জামায়াত। তাহলে কেমনে হবে? পাবেন কেমনে?’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের বাস্তবটা বুঝতে হবে। বাস্তবটা না বুঝে আপনারা এগোতে পারবেন না। আজকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান, উনি তো নর্থ বেঙ্গলের মানুষ, তাই না? বাড়ি তো বগুড়া। উনি আজকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বাবা প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাঁর মা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি এই এলাকার জন্য কাজ করতে চান।’
সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য ২৫টি চা-ঘর হস্তান্তরের উদ্যোগের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ‘একটা ছোট্ট একটা চায়ের ঘর, তারা এই দুস্থ মানুষগুলোকে দাঁড় করাচ্ছে, ২৫ জনকে দিচ্ছেন। ২৫ জনকে দেওয়া মনে হতে পারে খুব ছোট, কিন্তু এটা একটা বিশাল ব্যাপার! আমি যাদের দেখলাম, তাদের জন্য এটা গেম চেঞ্জার হতে পারে। তাদের জীবন বদলে যেতে পারে এটা দিয়ে।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মুসফিকুল ফজল আনসারী, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. সামসুজ্জামান সামু, রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, এবং লাভ শেয়ার বিডির পরিচালক জাহিদ খান।