দক্ষিণ এশিয়ায় ক্যানসার আক্রান্ত শিশুর ৬৮.৮ শতাংশই ভারতের
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) ৮টি সদস্য দেশের মধ্যে রেকর্ড হওয়া মোট শিশু ক্যানসার রোগীর প্রায় ৭০ শতাংশই ভারতের। চিকিৎসা বিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ - সাউথইস্ট এশিয়া’-তে প্রকাশিত এক নতুন জনসংখ্যা ভিত্তিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর এনডিটিভির।
গবেষণায় ২০২২ সালের ‘গ্লোবোক্যান’-এর তথ্যের ভিত্তিতে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভূটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় শিশুদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর হার বিশ্লেষণ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে সার্ক অঞ্চলে আনুমানিক মোট ৩৭,৭১৬টি শিশু নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে কেবল ভারতেই শনাক্ত হয়েছে ২৫,৯৩৯টি শিশু, যা পুরো অঞ্চলের মোট আক্রান্তের ৬৮.৮ শতাংশ।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে থাকা পাকিস্তানে আক্রান্তের সংখ্যা ৭,৮৪১ জন (২০.৮ শতাংশ)।
তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, কেবল বিপুল জনসংখ্যার কারণেই ভারতের এই আধিপত্য নয়। বয়সভিত্তিক ক্যানসারের হার এবং মৃত্যুহারের মধ্যে দেশভেদে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে, যা মূলত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা, দ্রুত ক্যানসার শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসার সুযোগের বৈষম্যকে নির্দেশ করে।
সার্কভুক্ত দেশগুলোতে শিশু ক্যানসারের চিত্র (২০২২):
গবেষণার প্রাক্কলন অনুযায়ী সার্ক অঞ্চলে ২০২২ সালে ৩৭,৭১৬ জন নতুন আক্রান্তের পাশাপাশি প্রায় ১৭,৬৯৮ জন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে।
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা-র মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্যানসার নজরদারি ব্যবস্থা এখনো সব জায়গায় সমান নয়। তবে ভারতে এটি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতের চেন্নাইভিত্তিক প্রথম ডেডিকেটেড শিশু ক্যানসার রেজিস্ট্রি জানিয়েছে, ২০২২-২৩ সালে প্রতি ১০ লাখ শিশুর মধ্যে ১৩৬ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে এবং চিকিৎসা গ্রহণে দুই বছর বেঁচে থাকার হার ছিল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।
আরও পড়ুনআরও পড়ুনফলের রসে কি শিশুর স্থূলতা ও ডায়াবেটিস বাড়তে পারে?
সার্ক অঞ্চলের ৮টি দেশেই শিশুদের ক্ষেত্রে ‘লিউকেমিয়া’ (রক্তের ক্যানসার) সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, যা মোট আক্রান্তের ৩৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ‘সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম’ বা স্নায়ুতন্ত্রের টিউমার, যা প্রায় ১২ শতাংশ কেসের জন্য দায়ী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক তথ্যের সঙ্গেও এই বিন্যাস হুবহু মিলে যায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিশুদের ক্যানসার প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যানসারের থেকে বেশ আলাদা।
জীবনযাত্রার ধরণ বা অসচেতনতার কারণে শিশুদের ক্যানসার হয় না এবং সাধারণ স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এটি আগেভাগে প্রতিরোধ করাও সম্ভব নয়। ফলে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই এর মূল প্রতিষেধক।
মৃত্যুহারে এত বড় ব্যবধানের কারণ কী?
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ‘মর্টালিটি-টু-ইনসিডেন্স রেশিও’ বা আক্রান্তের বিপরীতে মৃত্যুর হারের ব্যবধান।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এই অনুপাত শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে কম (০.৩০), আর আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি (০.৫৭)। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কায় শনাক্ত হওয়া শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর হার অনেক কম, কিন্তু আফগানিস্তানে অনেক বেশি। বিশেষ করে স্নায়ুতন্ত্রের টিউমারের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার মারাত্মক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবধানই প্রমাণ করে যে দেশগুলোর চিকিৎসা অবকাঠামো এবং বিশেষায়িত সেবার ক্ষেত্রে কতটা বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, উন্নত দেশগুলোতে ক্যানসারে আক্রান্ত ৮০ শতাংশের বেশি শিশু পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই হার এখনো ৩০ শতাংশের নিচে। দেরিতে শনাক্তকরণ, ভুল চিকিৎসা, আর্থিক অসচ্ছলতা, চিকিৎসা মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেই মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটছে।
গবেষকরা ভারতের জন্য দুটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন—প্রথমত সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং দ্বিতীয়ত প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা পৌঁছানো।
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে গবেষকরা সার্ক অঞ্চলে আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা বাড়ানো, দেশভিত্তিক শক্তিশালী ক্যানসার রেজিস্ট্রি স্থাপন করা এবং লিউকেমিয়াসহ বিভিন্ন ক্যানসারের ক্ষেত্রে একটি মানসম্মত ও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করার ওপর জোর দিয়েছেন।
শিশুদের ক্যানসার কি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য?
হ্যাঁ, সময়মতো শনাক্ত করা গেলে এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা দিলে শিশুদের অধিকাংশ ক্যানসারই পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কেমোথেরাপি, অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন ও আধুনিক থেরাপির মাধ্যমে শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী শিশু ক্যানসারে বেঁচে থাকার হার অন্তত ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সাউথ এশিয়ায় বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো—একটি শিশুর বেঁচে থাকা যেন কেবল সে কোন দেশে জন্মেছে বা পরিবার চিকিৎসা খরচ চালাতে পারছে কিনা, তার ওপর নির্ভর না করে। ভৌগোলিক ও আর্থিক বাধা পেরিয়ে সবার জন্য উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।