ঢাকা    শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩
দৈনিক পটিয়া

ভাটিয়ারীর শিপইয়ার্ডে প্রাণ গেল ৮ শ্রমিকের, গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ কাটার অভিযোগ


প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

ভাটিয়ারীর শিপইয়ার্ডে প্রাণ গেল ৮ শ্রমিকের, গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ কাটার অভিযোগ
ভাটিয়ারীর শিপইয়ার্ডে প্রাণ গেল ৮ শ্রমিকের, গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ কাটার অভিযোগ

একটি জাহাজ কাটার কাজ চলছিল। হঠাৎ একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। মুহূর্তেই বদলে যায় ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের স্বাভাবিক পরিবেশ। উদ্ধার করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও বুঝতে পারেন, জাহাজটির ভেতরে বিপজ্জনক গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে।

শুক্রবার সকালে ঘটে যাওয়া ওই দুর্ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত ও অসুস্থ হয়েছেন আরও কয়েকজন। তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পর প্রাথমিক অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—জাহাজটি কাটার আগে সেটি পুরোপুরি গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার শিকার জাহাজটি আগে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহার করা হতো। এ ধরনের জাহাজের বিভিন্ন ট্যাংকে বিপজ্জনক গ্যাস জমে থাকতে পারে। তাই জাহাজটি স্ক্র্যাপ করার আগে ট্যাংক পরীক্ষা করে গ্যাসমুক্ত করা বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার অংশ।

কিন্তু ভাটিয়ারীর এই ইয়ার্ডে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না, এখন সেটিই তদন্তের অন্যতম বিষয়।

যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা

শুক্রবার সকালে ইয়ার্ডে জাহাজটির ভেতরে হাউজকিপিংয়ের কাজ করছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। কাজের সময় ট্যাংক থেকে গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে তাঁরা একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে যান।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছে ট্যাংকের ভেতর থেকে শ্রমিকদের বের করে আনে। উদ্ধারকাজ শেষে তিনজনের মরদেহ পাওয়া যায়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও কয়েকজন মারা যান।

ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, প্রথম পর্যায়ে তিনজন ঘটনাস্থলে মারা যান। পরে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় আরও চারজনের মৃত্যু হয়।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে সীতাকুণ্ডের সানি জলদাস, পলাশ জলদাস, মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মনসুর ও নাসির সম্পর্কে দুই ভাই বলে জানা গেছে। নিহতদের অন্যদের মধ্যে জামালপুরের হাবিবুর রহমান, গাইবান্ধার খোকন ও আবদুল আলিম রানা রয়েছেন। আরেকজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি।

ট্যাংকে কী ছিল

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, এলএনজি পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত জাহাজের ট্যাংকে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস অবশিষ্ট থাকতে পারে। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তাঁরা কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাসের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলামের ভাষ্য, এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক গ্যাসমুক্ত করার পাশাপাশি ভেতরের পরিবেশ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে তাঁদের কাছে মনে হয়েছে, গ্যাসমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় ঘাটতি থাকার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে।

তবে দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্ত শেষ হলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন

শুধু জাহাজটি গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, তা-ই নয়; শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, ট্যাংকে প্রবেশের আগে গ্যাস পরীক্ষা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায় আসার কথা।

দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজে কাজ শুরুর আগে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়ম কতটা মানা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

তদন্তের আশ্বাস

দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিকদের দেখতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে। শিপইয়ার্ডে নিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না, কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না—তদন্তের মাধ্যমে তা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুর্ঘটনার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, একটি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কীভাবে যথাযথ নিরাপত্তা পরীক্ষা ছাড়া কাটার পর্যায়ে গেল এবং কাজ শুরুর আগে ট্যাংকের ভেতরের গ্যাসের উপস্থিতি যাচাই করা হয়েছিল কি না। তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

দৈনিক পটিয়া

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬


ভাটিয়ারীর শিপইয়ার্ডে প্রাণ গেল ৮ শ্রমিকের, গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ কাটার অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

একটি জাহাজ কাটার কাজ চলছিল। হঠাৎ একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। মুহূর্তেই বদলে যায় ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের স্বাভাবিক পরিবেশ। উদ্ধার করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও বুঝতে পারেন, জাহাজটির ভেতরে বিপজ্জনক গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে।


শুক্রবার সকালে ঘটে যাওয়া ওই দুর্ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত ও অসুস্থ হয়েছেন আরও কয়েকজন। তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।


ঘটনার পর প্রাথমিক অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—জাহাজটি কাটার আগে সেটি পুরোপুরি গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না।


ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার শিকার জাহাজটি আগে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহার করা হতো। এ ধরনের জাহাজের বিভিন্ন ট্যাংকে বিপজ্জনক গ্যাস জমে থাকতে পারে। তাই জাহাজটি স্ক্র্যাপ করার আগে ট্যাংক পরীক্ষা করে গ্যাসমুক্ত করা বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার অংশ।


কিন্তু ভাটিয়ারীর এই ইয়ার্ডে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না, এখন সেটিই তদন্তের অন্যতম বিষয়।


যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা


শুক্রবার সকালে ইয়ার্ডে জাহাজটির ভেতরে হাউজকিপিংয়ের কাজ করছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। কাজের সময় ট্যাংক থেকে গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে তাঁরা একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে যান।


খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছে ট্যাংকের ভেতর থেকে শ্রমিকদের বের করে আনে। উদ্ধারকাজ শেষে তিনজনের মরদেহ পাওয়া যায়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও কয়েকজন মারা যান।


ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, প্রথম পর্যায়ে তিনজন ঘটনাস্থলে মারা যান। পরে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় আরও চারজনের মৃত্যু হয়।


স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে সীতাকুণ্ডের সানি জলদাস, পলাশ জলদাস, মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মনসুর ও নাসির সম্পর্কে দুই ভাই বলে জানা গেছে। নিহতদের অন্যদের মধ্যে জামালপুরের হাবিবুর রহমান, গাইবান্ধার খোকন ও আবদুল আলিম রানা রয়েছেন। আরেকজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি।


ট্যাংকে কী ছিল


ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, এলএনজি পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত জাহাজের ট্যাংকে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস অবশিষ্ট থাকতে পারে। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তাঁরা কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাসের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।


চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলামের ভাষ্য, এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক গ্যাসমুক্ত করার পাশাপাশি ভেতরের পরিবেশ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে তাঁদের কাছে মনে হয়েছে, গ্যাসমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় ঘাটতি থাকার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে।


তবে দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্ত শেষ হলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।


নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন


শুধু জাহাজটি গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, তা-ই নয়; শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, ট্যাংকে প্রবেশের আগে গ্যাস পরীক্ষা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায় আসার কথা।


দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজে কাজ শুরুর আগে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়ম কতটা মানা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।


তদন্তের আশ্বাস


দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিকদের দেখতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে। শিপইয়ার্ডে নিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না, কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না—তদন্তের মাধ্যমে তা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


দুর্ঘটনার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, একটি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কীভাবে যথাযথ নিরাপত্তা পরীক্ষা ছাড়া কাটার পর্যায়ে গেল এবং কাজ শুরুর আগে ট্যাংকের ভেতরের গ্যাসের উপস্থিতি যাচাই করা হয়েছিল কি না। তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।


দৈনিক পটিয়া

সম্পাদক ও প্রকাশক: সৌরভ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক পটিয়া
ভাটিয়ারীর শিপইয়ার্ডে প্রাণ গেল ৮ শ্রমিকের, গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ কাটার অভিযোগ
0:00 0:00
1.0x