ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় পারিবারিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর কনের পক্ষের করা ধর্ষণ মামলায় বরকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ডাঙ্গি ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
সম্প্রতি ঘটা করে বর-কনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর কনে বরের বাড়িতেও যান। তবে কনের বয়স কম হওয়ায় বিয়ের নিবন্ধন হয়নি মর্মে কথা ওঠে। এ ঘটনায় উপজেলাজুড়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, পারিবারিক সম্মতিতে ধর্মীয় রীতি-নীতিসহ সামাজিকভাবে ধুমধাম করে বিয়ে হয় তাদের। গায়েহলুদ, নাচ-গান, বরযাত্রীসহ পালন করা হয় বিয়ের সব রীতি। তবে হঠাৎ কোনো বিয়েই হয়নি বলে দাবি করে বসেন কনে ও তার পরিবার। এতে অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগ এনে দায়েরকৃত মামলায় কারাগারে যেতে হয়েছে রুমন খন্দকার (২০) নামে এক তরুণকে।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২২ মে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী একই উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের মিরাজ মাতুব্বরের মেয়ে মিলা আক্তারকে (১৫) বিয়ে করেন রুমন খন্দকার। সামাজিক অনুষ্ঠান করে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের আগে কনের বাড়িতেও আয়োজন করা হয়েছিল গায়েহলুদের মতো অনুষ্ঠান। এরপর ৪০ জন বরযাত্রী নিয়ে যাওয়া হয় কনের বাড়িতে। সেখানে খাওয়া-দাওয়া শেষে দুই পরিবারের স্বজন, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়।
তবে কনের বয়স কম হওয়ায় নিবন্ধন করা হয়নি এবং দুই পরিবারের সম্মতি ছিল প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিবন্ধন করে নেওয়া হবে। পরে কনেকে বিয়ের রঙে সাজিয়ে আয়োজনের মধ্যেই নিয়ে যাওয়া হয় বরের বাড়িতে। সেই বিয়ের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির প্রমাণাদি ও অনুষ্ঠানের ভিডিও সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন ভুক্তভোগী পরিবার।
পরিবারটির ভাষ্য, বিয়ের দুদিন পর সামাজিক রীতি অনুযায়ী কনের বাড়িতে গেলে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।
বর রুমনের মামা হাফিজুর রহমান বলেন, আমার ভাগনের সঙ্গে বাসররাতে ওই মেয়ের মনোমালিন্য হয়। ফিরানিতে গিয়ে ওই মেয়ে আর বরের বাড়িতে আসতে চায় না। পরে জানতে পারি অন্য একজনের সঙ্গে ওই মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। এরপরও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু কয়েক দিন পর আবারও বাড়িতে ফিরে গেলে সে আর আসেনি, মেয়েটির পরিবারও আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়নি।
তিনি বলেন, এর প্রায় এক মাস পর গত ২ জুলাই গভীর রাতে হঠাৎ রুমনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় নগরকান্দা থানা পুলিশ। পরের দিন থানায় গিয়ে জানতে পারি একটি ধর্ষণ মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই মামলায় আদালতে শুনানি শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ২ জুলাই থানায় জহুরন খাতুন (৫২) নামে এক নারী মামলাটি দায়ের করেন। জহুরন বিয়ে হওয়া কিশোরীর সম্পর্কে দাদি।
মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৯ জুন বিকাল ৫টায় বাড়ির পাশ থেকে তার নাতনি মিলাকে একটি মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করে নিয়ে যান রুমন। এরপর রুমন খন্দকারদের বাড়িতে রেখে রাতভর ধর্ষণ করা হয় এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা হয়। পরদিন সকালে কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে পরিবারকে ঘটনাটি খুলে বলে মিলা। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ওই কিশোরী ও মামলার বাদী জহুরন খাতুনের দাবি, কোনো বিয়েই হয়নি। এছাড়া মামলার এজাহারে দেওয়া বর্ণনা দিয়ে ধর্ষণের বিচার দাবি করেন। তবে ছবি ও ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে তারা এড়িয়ে যান।
নগরকান্দা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাসুল সামদানি আজাদ বলেন, গত ২ জুলাই জহুরন খাতুন তার নাতনিকে নিয়ে থানায় আসেন। তাদের কাছে ছিল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারের চিকিৎসার ছাড়পত্র। যেখানে ধর্ষণের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করা হয়।
তবে ওই এজাহারে বিয়ের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি এবং পুলিশকে কিছু জানানোও হয়নি বলে দাবি করে তিনি বলেন, মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় সরকারিভাবে বিয়ের কোনো সুযোগই নেই। সামাজিক বিয়ে আইনগত বৈধতা নেই। এছাড়া কেউ যদি মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে এসে অভিযোগ করে, সেক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়েই মামলা নিতে হয়। এক্ষেত্রে সেটি হয়েছে।
রাসুল সামদানি আজাদ আরও বলেন, এ ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উপ-পরিদর্শক শহিদুল ইসলামকে। তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশি প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। আরও পড়ুনআরও পড়ুনদানবাক্সে প্রায় ৭১ লাখ টাকাসহ বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণ-রুপা
ফরিদপুর জজকোর্টের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন বলেন, আমাদের দেশে দুই পরিবার ও ছেলে-মেয়ের সম্মতিতে অহরহ বাল্যবিয়ে হচ্ছে। এখানেও তেমনটা হয়েছে, পারিবারিকভাবে বিয়ের পর সংসার হয়েছে তাদের। তবে, আইনের দৃষ্টিতে এই বিবাহ স্বীকৃত নয়। যার কারণে পারিবারিক কলহের জেরে ধর্ষণের মতো অভিযোগে ছেলেটিকে কঠিন মামলার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে, যা অমানবিক।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, বিয়েতে সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা হিসেবে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। প্রথমে তারা অবৈধ কাজ করেছে, বাল্যবিয়ে আড়াল করতে নিবন্ধন করেননি। পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে কনেপক্ষ এই সুযোগটাকে ব্যবহার করেছেন।