বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোর সমাধান এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনে ‘নতুন সুযোগের জানালা’ খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন ভারতের সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বিদ্যা ভূষণ সোনি।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক এই ভারতীয় রাষ্ট্রদূত আশা প্রকাশ করেছেন, এই সফরের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এটিই হতে পারে প্রথম ভারত সফর।
উল্লেখ্য, সাবেক রাষ্ট্রদূত বিদ্যা ভূষণ সোনি ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন পোড়খাওয়া কূটনীতিক। বিশ্বজুড়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সিডনিতে কনসাল-জেনারেল এবং বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং ইউক্রেনে তাঁর কর্মজীবনের ইতি টানেন।
উভয় দেশের কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এএনআই জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সম্ভাব্য এই দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সক্রিয় আলোচনা চলছে।
সাক্ষাৎকারে বিদ্যা ভূষণ সোনি বলেন, ‘আমি বেশ আশাবাদী। দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় সুরাহা করা প্রয়োজন। এর মধ্যে তিস্তা নদীর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে অধিকাংশ বিষয়ে সমঝোতা হলেও শেষ মুহূর্তে কিছু সূক্ষ্ম জায়গায় নীতিগত সিদ্ধান্ত বাকি রয়ে যায়।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় ভারত যাতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহী।
বিদ্যা ভূষণ সোনি বলেন, ‘মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভারত মধ্যস্থতাকারী বা কার্যকর আলোচনার ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ নয়াদিল্লির কথা শোনার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও ভারতের এই কূটনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগাতে চায়।’
বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে আলোকপাত করে সাবেক এই ভারতীয় কূটনীতিক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথেষ্ট ‘উন্মুক্ত বা উদার মানসিকতার’ পরিচয় দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘তিনি ভারতবিরোধী নন এবং ব্যক্তিগতভাবে ভারতবিরোধী কোনো বক্তব্য তিনি দেননি। তাই দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারের এই ইতিবাচক সুযোগটি কাজে লাগাতে ভারত সরকারও সতর্কভাবে এগোচ্ছে।’
বিদ্যা ভূষণ সোনির মতে, উভয় দেশের সামনে তৈরি হওয়া এই সংযোগ ও আলোচনার সুযোগটি হাতছাড়া হতে দেওয়া কোনো পক্ষের জন্যই ঠিক হবে না।
গত রোববার (১৬ আগস্ট) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মো. শহীদুল করিম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও এখনো চূড়ান্ত কোনো তারিখ নির্ধারিত হয়নি।
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতি এবং বক্তব্য প্রদানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এবং শরীফ ওসমান বিন হাদী হত্যা মামলার আসামিদের দ্বিপক্ষীয় বন্দী বিনিময় নীতি চুক্তির আওতায় ফেরত পাঠানোর জন্য ঢাকার পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর ঢাকা কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানায়। এরপরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমইএ) মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ওই অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম আয়োজন করেছিল। এতে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে ব্যক্ত করা কোনো মতামতকে সরকার সমর্থন করে না।
বিদ্যমান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেও রাজনৈতিক পর্যায়ের শীর্ষ যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর বাস্তবে রূপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করছেন ভারতীয় বিশ্লেষকেরা।