বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আটটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জাতীয় সংসদে ভোটাভুটি হয়েছে। একক প্রার্থী থাকায় পরের সাতবার ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এবার অবশ্য প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। ফলে ঘুরে ফিরে আলোচনায় উঠে আসছে ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা।
আগে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও সংবিধান সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নিয়ম করা হয়েছে। এই ভোটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নির্বাচনী কর্তার দায়িত্ব পালন করেন। ভোট হয় সংসদকক্ষে। এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুসারে, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হবে। এরপর হবে যাচাই-বাছাই। ১৮ আগস্ট মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোট হবে ২০ আগস্ট।
ক্ষমতাসীন বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। দলটির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলীয় প্রার্থী করার বিষয়টি অনেকটাই চূড়ান্ত। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট রাষ্ট্রপতি পদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে।
দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে সংসদে ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত। কারণ, জাতীয় সংসদে তাঁদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এরপরেও বিরোধী দলের প্রার্থী যদি শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহার না করেন তবে ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ ৩৪ বছর ১০ মাস ১২ দিন পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আবার ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা।
১৯৯১ সালের ভোটে যা হয়েছিল
১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস। ওই বছরের ৮ অক্টোবর দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ভোট হয়। ভোট পরিচালনা করেন তৎকালীন সিইসি বিচারপতি আবদুর রউফ। ৯ আগস্ট বেশির ভাগ জাতীয় পত্রিকা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের খবর ব্যানার লিড করেছিল।
১৯৯১ সালের ৯ আগস্টের দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজাদ ও ইনকিলাব পত্রিকার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে আজকের পত্রিকা।
পঞ্চম জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় সংরক্ষিত নারী আসনের ৩০ জনসহ ৩৩০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে বিএনপির ১৭০ জন, আওয়ামী লীগের ৯২ জন, জাতীয় পার্টির ৩৫ জন, জামায়াতের ২০ জন, সিপিবির পাঁচজন এবং ইসলামী ঐক্যজোট, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ, এনডিপি, জাসদ (সিরাজ), ওয়ার্কার্স পার্টির একজন করে সংসদ সদস্য ছিলেন। এর বাইরে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ছিলেন দুজন। এই ৩৩০ জন সদস্যের মধ্যে বিএনপির ১৭০ জন, আওয়ামী লীগের ৯১ জন, স্বতন্ত্রের দুজন এবং গণতন্ত্রী পার্টির একজন সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছিলেন। জাতীয় পার্টি নির্বাচন বয়কট করেছিল। জামায়াত, সিপিবি, ইসলামী ঐক্যজোট, জাসদ (সিরাজ), ওয়ার্কার্স পার্টি, এনডিপি, ন্যাপের সংসদ সদস্যরা ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন।
দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে সরকারদলীয় প্রার্থী ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর মধ্যে তিনি বিএনপির ১৭০ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর (বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও বর্তমান চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি) দুই ভোট পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এর মধ্যে দলের ৯১টি এবং গণতন্ত্রী পার্টির তৎকালীন সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভোট পেয়েছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বিদেশে থাকায় ভোট দিতে পারেননি।
দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজাদ ও ইনকিলাব পত্রিকার প্রতিবেদনে জানানো হয়, দুপুর ২টায় নির্বাচনী কর্তা সিইসি বিচারপতি আবদুর রউফের সভাপতিত্বে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। তিনি স্পিকারের আসনে বসেননি। দুপুর ২টা ৩ মিনিটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথমে ভোট দেন। এরপর ভোট দেন তৎকালীন সংসদের স্পিকার ও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস। এরপর একে একে বিএনপির সব প্রার্থী ভোট দেন। বিকেল ৩টা ৫ মিনিটের মধ্যে বিএনপির ১৭০ জনের ভোট শেষ হয়। এরপর দুজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ভোট দেন।
প্রতিবেদনগুলোয় বলা হয়, সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণের জন্য ওই দিন প্রতিবাদ করেছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। সেখানে বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা সিইসিকে উদ্দেশে বলেছিলেন, সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণের ফলে সংসদের পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে। পরে বিকেল ৩টা ৩৬ মিনিটে তিনি ভোট দেন। বিকেল ৪টা ১০ মিনিটের মধ্যে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা ভোট দেন। বিকেল ৫টা ৫ মিনিটের মধ্যে ভোট গণনা শেষ করেন সিইসি।
সংসদ সদস্যদের নম্বর বিভক্তি অনুযায়ী তাঁদের চারটি ভাগে ভাগ করে ভোটদানের ব্যবস্থা করা হয়। চারটি বক্সে ব্যালট পেপার রাখা হয়। বিএনপির রফিকুল ইসলাম মিয়া এবং আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ নিজ দলের প্রার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন। ৩৩০ জন ভোটারের মধ্যে ২৬৪ জন ভোট দেন। সবার ভোটই বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৌনে ৬টায় আবদুর রহমান বিশ্বাসকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এ সময় বিএনপির সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে, করতালি দিয়ে এবং হর্ষধ্বনির মাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে বদরুল হায়দার চৌধুরীর প্রাপ্ত ভোট ঘোষণার সময়েও আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা করতালি ও টেবিল চাপড়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। ওই রাতে আবদুর রহমান বিশ্বাসকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের ভোট নিজেদের বাক্সে আনার জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নানা চেষ্টা করা হয়েছিল। দলটির প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াত নেতা গোলাম আজমের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছিলেন। বিএনপির প্রার্থীও গোলাম আজমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ভোট নিশ্চিত করতে ১৯৯১ সালের ৭ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করেছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলগুলোর বিরুদ্ধে আশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয় ঐকমত্য না হওয়ায় রাষ্ট্রপতি পদে ভোটদানে বিরত ছিলেন জামায়াতের সংসদ সদস্যরা। দলটির সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষে থাকলেও ভোট দেননি।
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না দেওয়াসহ একাধিক কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বয়কট করেছিল জাতীয় পার্টি। তাদের সংসদ সদস্যরা সংসদে থাকলেও সংসদ কক্ষে উপস্থিত ছিলেন না।
এ ছাড়া ভোটদানে বিরত ছিলেন সিপিবি, ন্যাপ, জাসদ (সিরাজ) এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্যরা। এনডিপির সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী) ভোটদানে বিরত থাকা সম্পর্কে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ হায়দার চৌধুরীকে নির্বাচনে না নামালেই ভালো করত।
১৯৯১ সালের পর সাতবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় এই সাতবারের কোনোবারই ভোটের প্রয়োজন হয়নি। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ, ২০০১ সালে বিএনপি মনোনীত এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ২০০২ সালে বিএনপির প্রার্থী ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জিল্লুর রহমান, ২০১৩ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল হামিদ এবং সর্বশেষ ২০২৩ আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন নির্বাচন কমিশন একক প্রার্থীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করে গেজেট প্রকাশ করে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে প্রত্যক্ষ নির্বাচনপদ্ধতি চালু করা হয়। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালে দুইবার সাধারণ ভোটারের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়।
১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল এমএজি ওসমানী আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের সমর্থন নিয়ে প্রায় ২২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ৬৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে ড. কামাল হোসেন নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২৬ শতাংশ ভোট পান।
বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে এইচএম এরশাদ সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতায় বসার পর ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেন। ওই নির্বাচনে এরশাদ ৮৪ শতাংশ ভোট পান বলে সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ (হাফেজ্জী হুজুর)। তিনি ৬ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়েছিলেন বলে জানানো হয়েছিল।