জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তত ৭০ মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত দুই শতাধিক রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে মামলা তদন্তাধীন ও বিচারকাজ চলছে। তাদের মধ্যে অনেকে বয়স ও অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আবার তাদের মধ্যে অনেকেই প্রায় দুই বছর ধরে কারাগারে আছেন। তবে এখন পর্যন্ত ছয় মামলায় ৬২ জনের বিচার ট্রাইব্যুনালে শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও বিভিন্ন আদালতের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছরে আটকদের মধ্যে রয়েছেন ৪৩ জন সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ৪৫ জন সাবেক এমপি এবং ১০৩ জন সরকারি কর্মকর্তা; যাদের মধ্যে ১৬ জন বর্তমান ও সাবেক সেনা এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা। এ ছাড়া পাঁচজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ১৯ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ৩৬ দিনের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ওই সরকারের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় এক হাজার ৪০০ আন্দোলনকারী নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব মামলার বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের জন্য ঊর্ধ্বতন কমান্ডের দায়িত্ব প্রমাণিত হলে কোনো ব্যক্তিকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, তদন্তে সময় লাগছে, কারণ বেশিরভাগ প্রসিকিউটর, তদন্তকারী এবং এমনকি বর্তমান ট্রাইব্যুনালের বিচারকরাও আন্তর্জাতিক অপরাধের মামলা পরিচালনায় নতুন। বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখেই তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে। আটক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি সাবেক মন্ত্রী সাজাপ্রাপ্ত হাসানুল হক ইনু, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ঢাকা উত্তর সিটির সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক শিল্প উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক এমপি আবদুস সোবহান গোলাপ বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের মামলায় বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।
বেশ কয়েকটি মামলায় পলাতক আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সাবেক মন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক এমপি একেএম শামীম ওসমান, সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, সাবেক এমপি মাহবুবউল-আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মৃণাল কান্তি দাস, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, পুলিশের সাবেক দুই আইজি বেনজীর আহমেদ, জাবেদ পাটোয়ারী, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, বিপ্লব কুমার সরকার, ডিবির সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ, যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার প্রমুখ।
এ ছাড়া রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক বিমানমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফারুক খান, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, সাবেক ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো তদন্তাধীন রয়েছে। মামলাগুলোর তদন্তে কোনো অগ্রগতি না হলেও তারা কারাগারে আটক রয়েছেন। পাশাপাশি পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকলেও অপর সাবেক আইজিপি শহীদুল হক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা মাসুদউদ্দিন চৌধুরী ও মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত চলছে। গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত ১২ মামলায় এক বছরেরও বেশি সময় কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এর আগে মুক্তি পান সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকায় আরও আটক রয়েছেন সাবেক বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল ও এ কে এম নুরুল হুদা, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ প্রমুখ। তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার পাশাপাশি সাধারণ আদালতেও একাধিক মামলা রয়েছে। এ ছাড়া সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু, ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদ এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলার তদন্ত চলছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে অপহরণ, গুম ও হত্যার অভিযোগে পৃথক মামলায় ১৫ জন কর্মরত সেনাকর্মকর্তা রয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানও একাধিক মামলায় বিচারের মুখোমুখি। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তের জন্য ১০৫টি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং আরও পাঁচ শতাধিক অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে ২৪টি মামলা বিচারাধীন এবং ৩৬টি মামলার তদন্ত চলছে। যারা কারাগারে আটক এবং পলাতক আছেন তাদের বিচারও চলমান। পলাতক যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে সব প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার নথিপত্র ইন্টারপোলের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে।
ছয় মামলার রায়ে ৬২ জনের সাজা জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য নৃশংসতার অভিযোগে ইতোমধ্যে দুটি ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা পাঁচ মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ঊর্ধ্বতন কমান্ডের দায়িত্বে থাকার দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোতে ৬২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং একজনকে ক্ষমা করা হয়েছে। দোষী সাব্যস্তদের মধ্যে রয়েছেন ১৪ জন রাজনীতিবিদ, ১৭ জন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং ৩১ জন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, যাদের মধ্যে ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এক মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক সাবেক এমপি পলাতক মাহবুবউল-আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় যে কোনো দিন ঘোষণা হতে পারে। কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারের পর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত কারাগারে থাকা দশজন রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং আরেকজন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।